সূরা ফাতিহা আয়াত ১ তাফসীর ও বিস্তারিত ব্যাখ্যা ১/৬২৩৬

0
17
সূরা ফাতিহা আয়াত ১ তাফসীর

সূরা ফাতিহার ফজিলত ও তাফসীর: আয়াত ১/৬২৩৬ (বিসমিল্লাহ)

بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَٰنِ الرَّحِيمِ

উচ্চারণ: বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম।

সরল অনুবাদ: পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু করছি।

মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার অসীম দয়ায় আজ থেকে আমরা পবিত্র আল কুরআনের প্রতিটি আয়াতের ধারাবাহিক অনুবাদ ও বিস্তারিত ব্যাখ্যা (তাফসির) প্রজেক্ট শুরু করতে যাচ্ছি। এই বরকতময় যাত্রার প্রথম কদম হলো পবিত্র কুরআনের প্রথম সূরা ‘সূরা আল-ফাতিহা’-এর প্রথম আয়াত—”বিসমিল্লাহির রহমানির রাহিম”।

এটি কেবল কুরআনের শুরুর কোনো বাক্য নয়, বরং এটি সমগ্র ইসলামের মূল ভিত্তি, বরকতের চাবিকাঠি এবং বান্দার সাথে আল্লাহর সম্পর্কের এক অনন্য সেতু। এই আর্টিকেলে আমরা সূরা আল-ফাতিহার ১ নম্বর আয়াতের শাব্দিক অর্থ, এর ভেতরের গভীর তাফসির, ফজিলত এবং আমাদের দৈনন্দিন জীবনে এর বাস্তব প্রয়োগ নিয়ে বিশদ আলোচনা করব। সূরা ফাতিহা আয়াত ১ তাফসীর

সূরা আল-ফাতিহা এবং বিসমিল্লাহর সংযোগ

সূরা আল-ফাতিহা হলো কুরআনের সর্বশ্রেষ্ঠ সূরা। একে ‘উম্মুল কুরআন’ বা কুরআনের জননী বলা হয়। হানাফি মাযহাব এবং অনেক মুফাসসিরিনের মতে, বিসমিল্লাহ প্রতিটি সূরার শুরুর একটি স্বতন্ত্র আয়াত, যা দুটি সূরার মাঝে পার্থক্য করার জন্য নাজিল হয়েছে। তবে সূরা আল-ফাতিহার ক্ষেত্রে এটিকে প্রথম আয়াত হিসেবে গণনা করা হয়। যেকোনো শুভ কাজ আল্লাহর নামে শুরু করার যে ঐশ্বরিক নিয়ম ইসলাম আমাদের শিখিয়েছে, তার বাস্তব রূপ হলো এই আয়াত।

শাব্দিক অর্থ ও বিশ্লেষণ

আয়াতটিকে গভীরভাবে বুঝতে হলে এর প্রতিটি শব্দের অর্থ আলাদাভাবে জানা প্রয়োজন:

  • বি (بِ): এর অর্থ ‘দ্বারা’, ‘সাহায্যে’ বা ‘সাথে’।
  • ইসম (اسْمِ): এর অর্থ হলো ‘নাম’। অর্থাৎ ‘বিসম’ মানে হলো ‘নামের দ্বারা’ বা ‘নামে’।
  • আল্লাহ (اللَّهِ): এটি সৃষ্টিকর্তার সত্তাগত নাম। মহাবিশ্বের একমাত্র উপাস্যের সুনির্দিষ্ট নাম হলো আল্লাহ।
  • আর-রাহমান (الرَّهْمَٰنِ): এর অর্থ পরম করুণাময়। এটি আল্লাহর এমন এক দয়া যা সৃষ্টিজগতের সবার জন্য ব্যাপক—মুমিন, কাফের সবাই দুনিয়াতে এই দয়ার ভাগীদার।
  • আর-রাহিম (الرَّحِيمِ): এর অর্থ অসীম দয়ালু। এটি আল্লাহর বিশেষ রহমত, যা পরকালে কেবল মুমিন বা বিশ্বাসীদের জন্য নির্ধারিত থাকবে। সূরা ফাতিহা আয়াত ১ তাফসীর

‘আল্লাহ’ নামের গভীর তত্ত্ব

‘আল্লাহ’ শব্দটি কোনো সাধারণ উপাধি নয়। পৃথিবীর ইতিহাসে কোনো যুগে কোনো মুশরিক বা কাফের তাদের কোনো দেব-দেবী বা মূর্তির নাম ‘আল্লাহ’ রাখেনি। আল্লাহ নামের একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য হলো, এর থেকে কোনো অক্ষর বাদ দিলেও তার অর্থ আল্লাহর দিকেই নির্দেশ করে। যেমন: ‘আল্লাহ’ থেকে প্রথম ‘আলিফ’ বাদ দিলে থাকে ‘লিল্লাহ’ (আল্লাহর জন্য)। আবার প্রথম ‘লাম’ বাদ দিলে থাকে ‘লাহু’ (তাঁর জন্য)। সবশেষে শুধু ‘হু’ (তিনি) রাখলেও তা আল্লাহকেই বোঝায়। সূরা ফাতিহা আয়াত ১ তাফসীর

আর-রাহমান ও আর-রাহিম: দয়ার দুই সমুদ্র

ইমাম ইবনুল কায়্যিম (রহ.) বলেন, ‘আর-রাহমান’ শব্দটির গঠন এমন যা আল্লাহর জাত বা সত্তার সাথে সম্পৃক্ত ব্যাপক দয়াকে বোঝায়। আর ‘আর-রাহিম’ শব্দটি সেই দয়ার প্রকাশ বা বান্দার ওপর তার প্রভাবকে বোঝায়।

  • দুনিয়াতে সাধারণ দয়া: আল্লাহ ‘আর-রাহমান’ বলেই আজ পৃথিবীতে যারা তাঁর অস্তিত্ব অস্বীকার করছে, তাদেরকেও তিনি আলো, বাতাস এবং রিজিক দিয়ে বাঁচিয়ে রাখছেন।
  • আখিরাতে বিশেষ দয়া: আল্লাহ ‘আর-রাহিম’ বলেই হাশরের ময়দানে কঠিন বিপদের সময় তিনি তাঁর গুনাহগার মুমিন বান্দাদের ক্ষমা করে জান্নাত দান করবেন।

বিসমিল্লাহির রহমানির রাহিম এর অলৌকিক ফজিলত

হাদিস শরিফে বিসমিল্লাহর অসংখ্য ফজিলত বর্ণিত হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

“যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ কাজ যদি বিসমিল্লাহ ছাড়া শুরু করা হয়, তবে তা লেজকাটা বা বরকতহীন হয়ে যায়।” (মুসনাদে আহমাদ)।

  • শয়তানের কবল থেকে সুরক্ষা: যখন কোনো ব্যক্তি তার ঘরে প্রবেশ করার সময় বা খাবার খাওয়ার সময় বিসমিল্লাহ বলে, তখন শয়তান তার সঙ্গীসাথীদের বলে, “এই ঘরে আজ তোমাদের থাকারও জায়গা নেই, খাওয়ারও কোনো অংশ নেই।”
  • কাজে বরকত বৃদ্ধি: সামান্য কোনো খাবারে বা কাজে বিসমিল্লাহর বরকতে আল্লাহ এমন বরকত দেন, যা কল্পনাতীত।
  • মানসিক প্রশান্তি: যখন একজন মুমিন কোনো কাজ শুরুর আগে বলে যে সে আল্লাহর নামে শুরু করছে, তখন তার মন থেকে সমস্ত ভয় ও হতাশা দূর হয়ে যায়। সূরা ফাতিহা আয়াত ১ তাফসীর

দৈনন্দিন জীবনে বিসমিল্লাহর ব্যবহারিক প্রয়োগ

আমাদের সকাল থেকে ঘুমাতে যাওয়া পর্যন্ত প্রতিটি পদক্ষেপে বিসমিল্লাহ বলার অভ্যাস করা উচিত:

  • খাবারের শুরুতে: খাওয়ার শুরুতে বিসমিল্লাহ বলা সুন্নাত। যদি শুরুতে ভুলে যায়, তবে মনে পড়ার সাথে সাথে ‘বিসমিল্লাহি আওয়ালাহু ওয়া আখিরাহু’ পড়তে হয়।
  • ঘর থেকে বের হওয়ার সময়: ‘বিসমিল্লাহি তাওয়াক্কালতু আলাল্লাহ’ পড়লে ফেরেশতারা আল্লাহর পক্ষ থেকে সেই বান্দার নিরাপত্তার দায়িত্ব নেন।
  • পোশাক পরিধান ও অজুর সময়: অজুর শুরুতে বিসমিল্লাহ বলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

❓ সচরাচর জিজ্ঞাস্য প্রশ্নাবলী

বিসমিল্লাহির রহমানির রাহিম কি আলাদা আয়াত?

এই বিষয়ে ফকিহ ও মুফাসসিরদের মধ্যে দুটি মতামত রয়েছে। ইমাম শাফেঈ (রহ.)-এর মতে, এটি সূরা আল-ফাতিহার একটি আনুষ্ঠানিক আয়াত। অন্যদিকে ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে, এটি পুরো কুরআনের একটি স্বতন্ত্র আয়াত, যা দুটি সূরার মধ্যে পার্থক্য করার জন্য এবং বরকত হাসিলের জন্য প্রতি সূরার শুরুতে লেখা হয়েছে।

কোনো গুনাহের বা হারাম কাজ করার শুরুতে কি বিসমিল্লাহ বলা যাবে?

না, কোনো স্পষ্ট হারাম, কবিরা গুনাহ বা অবৈধ কাজের শুরুতে বিসমিল্লাহ বলা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। ইসলামের বিধান অনুযায়ী, কোনো হারাম কাজের আগে আল্লাহর নাম নেওয়া আল্লাহ তাআলার পবিত্র নামের সাথে উপহাস করার শামিল, যা ঈমান ধ্বংসের কারণ হতে পারে।

পরীক্ষার খাতায় বা চিঠির শুরুতে সংক্ষেপে ‘৭৮৬’ লেখা কি বিসমিল্লাহর সমতুল্য?

না, ‘৭৮৬’ সংখ্যাটি হলো আবজাদ পদ্ধতি বা সংখ্যার হিসাব অনুযায়ী বিসমিল্লাহর অক্ষরগুলোর গাণিতিক যোগফল মাত্র। এটি কোনোভাবেই মূল আরবির সমতুল্য নয়। কোনো বরকত পেতে হলে সরাসরি পূর্ণ ‘বিসমিল্লাহির রহমানির রাহিম’ মুখে উচ্চারণ করতে হবে বা লিখতে হবে।

🤲 দ্বীনি কাজে আপনার সহযোগিতা কাম্য

প্রিয় পাঠক, ‘আল হাকিম’ (alhakimbd.top) একটি সম্পূর্ণ অলাভজনক ইসলামিক প্ল্যাটফর্ম। প্রতিদিন লাখো মানুষের কাছে সঠিক দ্বীনি জ্ঞান, কুরআন-হাদিসের আলো এবং বিশুদ্ধ ইসলামিক কন্টেন্ট পৌঁছে দেওয়াই আমাদের একমাত্র লক্ষ্য। এই বিশাল দ্বীনি দাওয়াহ কাজটি সচল রাখতে আপনাদের আন্তরিক সহযোগিতা ও অনুদান অত্যন্ত প্রয়োজন। আপনার দেওয়া একটি ছোট কন্ট্রিবিউশন হতে পারে আপনার জন্য চলমান সদকায়ে جاریہ (সদকায়ে জারিয়া)। সূরা ফাতিহা আয়াত ১ তাফসীর

আপনি যদি আমাদের এই দ্বীনি প্রচারণায় আর্থিক সহযোগিতা করতে চান, তবে আপনার সামর্থ্য অনুযায়ী অনুদান পাঠাতে পারেন। সূরা ফাতিহা আয়াত ১ তাফসীর

(ডোনেশন দিতে বা বিস্তারিত জানতে আমাদের ডোনেশন পেইজ ভিজিট করুন অথবা সরাসরি যোগাযোগ করুন।)

Tags: সূরা ফাতিহা আয়াত ১ তাফসীর, বিসমিল্লাহির রহমানির রাহিম, সূরা ফাতিহা তাফসির, কুরআন অনুবাদ বাংলা, আল হাকিম, কুরআন [A1/৬২৩৬]

ভাই, আপনি খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটা খটকা ধরেছেন! মনে এই প্রশ্নটা আসা খুব স্বাভাবিক যে, সব সূরার আগেই তো “বিসমিল্লাহির রহমানির রাহিম” আছে, তাহলে এটাকে শুধু এখানে ১ নম্বর আয়াত ধরা হচ্ছে কেন? সূরা ফাতিহা আয়াত ১ তাফসীর

এই বিষয়ে ইসলামের বড় বড় ইমাম এবং মুফাসসিরদের (কুরআন গবেষক) মধ্যে সুনির্দিষ্ট কিছু মতামত আছে। সহজ কথায় ব্যখ্যাটি নিচে দেওয়া হলো:

১. সব সূরার আগের বিসমিল্লাহ কি আয়াত?

পবিত্র কুরআনের সূরা তাওবা ছাড়া বাকি ১১৩টি সূরার শুরুতেই “বিসমিল্লাহির রহমানির রাহিম” লেখা আছে। তবে অধিকাংশ ইসলামিক স্কলার ও ইমামদের (যেমন ইমাম আবু হানিফা রহ.) মতে—সব সূরার শুরুতে থাকা বিসমিল্লাহগুলো ওই নির্দিষ্ট সূরার নিজস্ব কোনো আয়াত নয়। সেগুলো মূলত দুটি সূরার মাঝে পার্থক্য করার জন্য এবং বরকত হিসেবে শুরুতে যুক্ত করা হয়েছে। সূরা ফাতিহা আয়াত ১ তাফসীর

২. সূরা আল-ফাতিহার ক্ষেত্রে এটি কেন ১ নম্বর আয়াত?

অন্যান্য সূরার ক্ষেত্রে বিসমিল্লাহকে আলাদা আয়াত না ধরা হলেও, সূরা আল-ফাতিহার ক্ষেত্রে এটিকে ১ নম্বর আয়াত হিসেবে গণনা করা হয়। এর পেছনে দুটি প্রধান কারণ রয়েছে:

  • ইমাম শাফেঈ (রহ.)-এর মতামত: ইমাম শাফেঈ এবং মক্কার ক্বারীগণের মতে, বিসমিল্লাহির রহমানির রাহিম সরাসরি সূরা আল-ফাতিহারই প্রথম আয়াত।
  • ৭টি আয়াতের হিসাব মিলানো: কুরআনে সূরা আল-ফাতিহাকে “সাবউয়ান মিনাল মাছানি” বা “বারবার পঠিত সাতটি আয়াত” বলা হয়েছে। এখন বিসমিল্লাহ-কে যদি ১ নম্বর আয়াত ধরা হয়, তবে “লা’আলাইহিম” পর্যন্ত গিয়ে ঠিক ৭টি আয়াত পূর্ণ হয়।
  • (আবার যারা বিসমিল্লাহকে প্রথম আয়াত ধরেন না, তারা সূরার শেষ আয়াতটিকে দুই ভাগ করে ৭টি আয়াত মেলান।)

সংক্ষেপে উত্তর:

অন্যান্য সূরার আগে বিসমিল্লাহ থাকলেও তা সূরার অংশ বা আয়াত নয়, বরং সূরার শুরুর একটি বরকতময় সংকেত। কিন্তু সূরা আল-ফাতিহার ক্ষেত্রে এটি আনুষ্ঠানিকভাবে সূরার ভেতরের ১ নম্বর আয়াত হিসেবেই গণ্য |

এই তাফসীরটি তৈরি করতে নির্ভরযোগ্য এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইসলামিক সোর্স ও তাফসীরগ্রন্থের সাহায্য নেওয়া হয়েছে। আপনি চাইলে মূল উৎসগুলো নিচে ক্লিক করে দেখে নিতে পারেন:

Don’t miss these tips!

We don’t spam! Read our privacy policy for more info.

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here