📚 সূরা ফাতিহার ফজিলত ও তাফসীর: আয়াত ৩/৬২৩৬ (আর-রাহমানির রাহিম)
মূল আয়াত ও সরল অর্থ:
الرَّحْمَٰنِ الرَّحِيمِ
উচ্চারণ: আর-রাহমানির রাহিম।
সরল অনুবাদ: যিনি পরম করুণাময়, অতি দয়ালু।
Table of Contents
পবিত্র আল কুরআনের ধারাবাহিক তাফসীর প্রজেক্টের প্রথম ও দ্বিতীয় পর্বে আমরা যথাক্রমে “বিসমিল্লাহির রহমানির রাহিম” এবং “আলহামদু লিল্লাহি রাব্বিল আলামিন” এর গভীর রহস্য, শাব্দিক বিশ্লেষণ এবং আমাদের ব্যবহারিক জীবন নিয়ে আলোচনা করেছি। আজ তৃতীয় পর্বে আমরা আলোচনা করব সূরা আল-ফাতিহার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং মহিমান্বিত ৩ নম্বর আয়াত—”আর-রাহমানির রাহিম”। সূরা ফাতিহা আয়াত ৩ তাফসীর
এই আয়াতটি পবিত্র কুরআনের অন্যতম প্রধান ভিত্তি, কারণ এর মাধ্যমে মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা তাঁর সৃষ্টিজগতের কাছে নিজের পরম দয়া ও করুণার গুণটি সবচেয়ে বড় করে তুলে ধরেছেন। অনেকে ভাবতে পারেন, এই দুটি শব্দ তো আমরা বিসমিল্লাহর ভেতরেই পড়েছি, তাহলে আলাদা আয়াত হিসেবে আবার কেন এটি এলো? এই আর্টিকেলে আমরা সূরা ফাতিহা আয়াত ৩ তাফসীর এর শাব্দিক বিশ্লেষণ, ব্যাকরণগত গভীরতা, বিসমিল্লাহর সাথে এর সূক্ষ্ম পার্থক্য, সালাফে সালেহীনদের মতামত এবং আমাদের ব্যক্তিগত ও মানসিক জীবনে এর অলৌকিক প্রভাব নিয়ে ২,০০০ শব্দেরও বেশি এক বিস্তারিত ও গবেষণামূলক আলোচনা করব। সূরা ফাতিহা আয়াত ৩ তাফসীর
২. শাব্দিক অর্থ ও ব্যাকরণগত গভীর বিশ্লেষণ
সূরা ফাতিহা আয়াত ৩ তাফসীর গভীরভাবে অনুধাবন করতে হলে আমাদের এই দুটি মহিমান্বিত নামের মূল উৎস বা ‘রুট ওয়ার্ড’ (Root Word) জানতে হবে। ‘রাহমান’ এবং ‘রাহিম’—দুটি শব্দই এসেছে আরবি মূল ধাতু ‘রূহাম’ (رَحْمَةٌ – Rahmah) থেকে, যার অর্থ হলো দয়া, মমনতা, করুণা এবং প্রীতি। তবে ব্যাকরণগত কাঠামোর কারণে এই দুটি শব্দের অর্থের মধ্যে এক বিশাল ও চমৎকার পার্থক্য তৈরি হয়েছে। সূরা ফাতিহা আয়াত ৩ তাফসীর
আর-রাহমান (الرَّحْمَٰنُ)
আরবি ব্যাকরণের নিয়ম অনুযায়ী, ‘রাহমান’ শব্দটি ‘ফালান’ (فَعْلَانُ) ওজনের ওপর গঠিত। এই ওজনের শব্দগুলো সাধারণত এমন কোনো গুণকে বোঝায় যা অত্যন্ত তীব্র, উপচে পড়া এবং সীমাহীন, কিন্তু যা সাময়িক হতে পারে। যেমন: ‘আকশান’ (তীব্র তৃষ্ণার্ত) বা ‘গদবান’ (তীব্র রাগান্বিত)। সূরা ফাতিহা আয়াত ৩ তাফসীর
- তাৎপর্য: আল্লাহ যখন ‘রাহমান’, তার মানে তাঁর দয়া ও করুণা মহাসমুদ্রের মতো উথলে উঠছে এবং তা সমগ্র সৃষ্টিজগতের ওপর একযোগে বর্ষিত হচ্ছে। এই দয়া এতটাই বিশাল যে, এর কোনো সীমা নেই। দুনিয়াতে যারা আল্লাহকে বিশ্বাস করে (মুমিন) এবং যারা বিশ্বাস করে না (কাফের, মুশরিক)—সবাই আল্লাহর ‘রাহমান’ গুণের কারণে সমানভাবে অক্সিজেন পাচ্ছে, আলো পাচ্ছে, রিজিক পাচ্ছে এবং পৃথিবীতে বেঁচে থাকার সুযোগ পাচ্ছে। সূরা ফাতিহা আয়াত ৩ তাফসীর
আর-রাহিম (الرَّحِيمُ)
অন্য দিকে, ‘রাহিম’ শব্দটি ‘ফাইলুন’ (فَعِيلُ) ওজনের ওপর গঠিত। আরবি ব্যাকরণে এই ওজনের শব্দগুলো এমন গুণকে প্রকাশ করে যা চিরস্থায়ী, ধীরস্থির, শান্ত এবং যা কখনো শেষ হয় না।
- তাৎপর্য: আল্লাহ যখন ‘রাহিম’, তার মানে তাঁর এই দয়া কখনো বন্ধ হবে না, এটি অনন্তকাল ধরে চলতে থাকবে। মুফাসসিরগণ বলেন, আল্লাহর ‘রাহিম’ গুণের বিশেষ অংশটি সংরক্ষিত থাকবে শুধুমাত্র পরকালে এবং শুধুমাত্র বিশ্বাসী মুমিন বান্দাদের জন্য। হাশরের ময়দানে, মিযানের পাল্লায় এবং জান্নাতে মুমিনরা আল্লাহর যে বিশেষ ক্ষমা ও মমতা লাভ করবে, তা আল্লাহর এই ‘রাহিম’ নামেরই বহিঃপ্রকাশ।
৩. বিসমিল্লাহর সাথে এই আয়াতের পুনরাবৃত্তির রহস্য কী?
একটি সাধারণ প্রশ্ন অনেকের মনেই জাগতে পারে—আমরা তো ১ নম্বর আয়াতেই (বিসমিল্লাহির রহমানির রাহিম) এই দুটি নাম পড়েছি। তাহলে ঠিক এক আয়াত পরেই (৩ নম্বর আয়াতে) আবার কেন ‘আর-রাহমানির রাহিম’ বলা হলো? পবিত্র কুরআনে কোনো শব্দের পুনরাবৃত্তি কখনো অর্থহীন হয় না। এর পেছনে ৩টি প্রধান কারণ রয়েছে:
১. ভয় ও আশার ভারসাম্য (Fear and Hope): ২ নম্বর আয়াতে আল্লাহ নিজেকে বলেছেন ‘রাব্বিল আলামিন’ (সৃষ্টিজগতের প্রতিপালক ও শাসক)। যখন আমরা চিন্তা করি আল্লাহ সমস্ত মহাবিশ্বের একমাত্র শাসক ও বিচারক, তখন আমাদের মনে এক ধরণের ভয় বা সম্ভ্রম তৈরি হয় যে—তিনি যদি আমাদের গুনাহের জন্য শাস্তি দেন, তবে আমাদের কী হবে? বান্দার মন থেকে এই ভয় দূর করতে এবং আশার আলো জ্বালাতে আল্লাহ ঠিক পরের আয়াতেই বললেন, “ভয় পেও না, আমি তোমাদের যে রব, আমি একই সাথে পরম করুণাময় ও অতি দয়ালু (আর-রাহমানির রাহিম)।”
২. লালন-পালনের মূল ভিত্তি দয়া: আল্লাহ যে আমাদের ‘রব’ বা লালনকর্তা, তাঁর এই লালন-পালনের মূল ভিত্তি কিন্তু রাগ বা কঠোরতা নয়, বরং দয়া। তিনি আমাদের প্রতিদিন যে রিজিক দেন, তা আমাদের কোনো যোগ্যতার কারণে নয়, বরং তাঁর দয়ার কারণে দেন—এই সত্যটি প্রতিষ্ঠা করতেই ২ নম্বর আয়াতের পর ৩ নম্বর আয়াতটি এসেছে।
৩. তাওহীদের গভীর শিক্ষা: বিসমিল্লাহতে এই নামগুলো এসেছে একটি কাজের শুরুতে বরকত নেওয়ার জন্য। আর সূরা ফাতিহার ভেতরে এই নামগুলো এসেছে আল্লাহর নিজস্ব স্থায়ী গুণ হিসেবে তাঁর প্রশংসা (হামদ) করার জন্য। সূরা ফাতিহা আয়াত ৩ তাফসীর
৪. আল্লাহর দয়ার বিশালতা: হাদিসের অলৌকিক বর্ণনা
রাসুলুল্লাহ (সা.) বিভিন্ন হাদিসে আল্লাহর এই দয়ার পরিমাণ বোঝাতে গিয়ে এমন কিছু উদাহরণ দিয়েছেন যা শুনলে যেকোনো মুমিনের চোখ অশ্রুসিক্ত হয়ে যাবে। সূরা ফাতিহা আয়াত ৩ তাফসীর আমাদের এই হাদিসগুলোর কথা মনে করিয়ে দেয়:
৯৯ ভাগ দয়া পরকালের জন্য
হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
“আল্লাহ তাআলা দয়া ও করুণাকে ১০০টি ভাগে বিভক্ত করেছেন। তার মধ্যে মাত্র ১ ভাগ দয়া তিনি দুনিয়াতে সমস্ত সৃষ্টির মাঝে অবতীর্ণ করেছেন। এই ১ ভাগ দয়ার কারণেই দুনিয়ার মানুষ, জিন, পশুপাখি একে অপরের প্রতি মমত দেখায়। এমনকি একটি ঘোড়া বা গাভী যে তার বাচ্চার গা চাটে বা বাচ্চার গায়ে যাতে আঘাত না লাগে সেজন্য পা তুলে রাখে—সেটাও ওই ১ ভাগ দয়ার অংশ। আর বাকি ৯৯ ভাগ দয়া আল্লাহ নিজের কাছে রেখে দিয়েছেন, যা দিয়ে তিনি কেয়ামতের দিন তাঁর বান্দাদের ওপর দয়া করবেন।” (সহীহ বুখারী ও মুসলিম)।
মায়ের চেয়েও কোটি গুণ দয়ালু
একবার এক যুদ্ধক্ষেত্র থেকে কিছু যুদ্ধবন্দী রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর দরবারে হাজির করা হলো। তাদের মধ্যে এক নারী ছিলেন, যার স্তন দুধে পূর্ণ ছিল। সে তার বাচ্চাকে হারিয়ে ব্যাকুল হয়ে খুঁজছিল। হঠাত সে ভিড়ের মধ্যে তার শিশুকে পেয়ে বুকে জড়িয়ে ধরে দুধ খাওয়াতে লাগল। এই দৃশ্য দেখে রাসুলুল্লাহ (সা.) সাহাবিদের জিজ্ঞেস করলেন, “তোমরা কি মনে করো এই নারী কখনো তার এই সন্তানকে আগুনে ছুড়ে ফেলে দিতে পারে?” সাহাবিরা বললেন, “আল্লাহর কসম, কখনো না!” তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন:
“এই মা তার সন্তানের প্রতি যতটুকু দয়ালু, মহান আল্লাহ তাঁর বান্দাদের প্রতি তার চেয়েও কোটি গুণ বেশি দয়ালু।” (সহীহ মুসলিম)।
৫. সালাফে সালেহীন ও মুফাসসিরগণের দৃষ্টিতে এই আয়াতের ব্যাখ্যা
ইসলামের প্রখ্যাত মুফাসসিরগণ এই আয়াতের গভীরতা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে মানবজাতির জন্য চমৎকার কিছু বাণী রেখে গিয়েছেন:
- ইমাম ইবনে কাসীর (রহ.) তাঁর বিখ্যাত তাফসীরে লিখেছেন: “আল্লাহর ‘রাহমান’ নামটি অন্য কারও জন্য ব্যবহার করা সম্পূর্ণ হারাম। কারণ এই তীব্র ও সর্বব্যাপী দয়া আল্লাহ ছাড়া আর কারও হতে পারে না। কিন্তু ‘রাহিম’ শব্দটি গুণবাচক হিসেবে মানুষের ক্ষেত্রেও সীমিত অর্থে ব্যবহার করা যায় (যেমন আল্লাহ নিজেই রাসুলুল্লাহ সা. কে কুরআনে ‘রাউফুর রাহিম’ বা দয়ালু বলেছেন)।” সূরা ফাতিহা আয়াত ৩ তাফসীর
- হাসান বসরী (রহ.) বলেন: “যদি আল্লাহ ‘আর-রাহমান’ না হতেন, তবে দুনিয়ার কোনো কাফের বা পাপিষ্ঠ ব্যক্তি এক ফোঁটা পানি খাওয়ারও সুযোগ পেত না। আর তিনি যদি ‘আর-রাহিম’ না হতেন, তবে কোনো গুনাহগার মুমিন পরকালে ক্ষমা পেয়ে জান্নাতে যেতে পারত না।”
- ইমাম ইবনুল কায়্যিম (রহ.) বলেন: “বান্দা যখন বুঝতে পারে তার রবের সবচেয়ে বড় পরিচয় তিনি ‘দয়ালু’, তখন বান্দার মন থেকে হতাশা দূর হয়ে যায়। সে যত বড় গুনাহই করুক না কেন, সে জানে তওবা করলে তার রবের দয়ার মহাসমুদ্র তার সব গুনাহ ধুয়ে মুছে সাফ করে দেবে।” সূরা ফাতিহা আয়াত ৩ তাফসীর
৬. মানসিক প্রশান্তি ও জীবন গঠনে ‘আর-রাহমানির রাহিম’-এর প্রভাব
বর্তমান যুগে মানুষের মানসিক সমস্যার অন্যতম প্রধান কারণ হলো ‘নিঃসঙ্গতা’ এবং ‘অপরাধবোধ’ (Guilt)। মানুষ যখন কোনো ভুল বা পাপ কাজ করে ফেলে, তখন শয়তান তার মনে কুসংস্কারে ঢুকিয়ে দেয় যে—”তুমি তো শেষ, আল্লাহ তোমাকে কখনো ক্ষমা করবেন না।” এর ফলে মানুষ আরও বেশি পাপের সাগরে ডুবে যায় অথবা ডিপ্রেশনে চলে যায়। সূরা ফাতিহা আয়াত ৩ তাফসীর
সূরা ফাতিহা আয়াত ৩ তাফসীর আমাদের এই মানসিক ট্র্যাপ থেকে মুক্ত করে। এই আয়াত আমাদের প্রতিদিন মনে করিয়ে দেয় যে, আমাদের সৃষ্টিকর্তা কোনো নিষ্ঠুর শাসক নন। তিনি পরম দয়ালু। আপনি যতই ভুল করুন না কেন, আপনি যখনই অনুতপ্ত হয়ে বলবেন “ইয়া রাহমান, আমাকে ক্ষমা করো”, সাথে সাথে তাঁর রহমতের দরজা আপনার জন্য খুলে যাবে। মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, একজন মানুষ যখন বিশ্বাস করে যে তাকে ভালোবাসার এবং তার ভুল ক্ষমা করার মতো একজন পরম শক্তিশালী সত্তা আছেন, তখন তার ভেতরের মানসিক আত্মবিশ্বাস ও শান্তি বহুগুণ বেড়ে যায়। সূরা ফাতিহা আয়াত ৩ তাফসীর
৭. দৈনন্দিন জীবনে এই আয়াতের বাস্তব ও ব্যবহারিক প্রয়োগ
সূরা ফাতিহা আয়াত ৩ তাফসীর থেকে শিক্ষা নিয়ে আমাদের বাস্তব জীবনে ৩টি বড় পরিবর্তন আনা উচিত:
১. সৃষ্টির প্রতি দয়াশীল হওয়া: রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “যারা দুনিয়াবাসীর ওপর দয়া করে, আরশের ওপর থাকা আল্লাহও তাদের ওপর দয়া করেন।” (তিরমিজি)। আমরা যদি আল্লাহর দয়া পেতে চাই, তবে আমাদেরও মানুষ, পশুপাখি এবং চারপাশের প্রকৃতির প্রতি দয়ালু ও নরম মনের অধিকারী হতে হবে। ২. ক্ষমা করার মানসিকতা তৈরি করা: আল্লাহ যেহেতু আমাদের এত বড় বড় ভুল প্রতিদিন ক্ষমা করছেন, তাই আমাদেরও উচিত মানুষের ছোটখাটো ভুলগুলোকে ক্ষমা করে দেওয়া। ৩. কখনো আশাহত না হওয়া: জীবনের যেকোনো কঠিন পরিস্থিতিতে, ব্যবসায় লস হলে, বা কোনো বিপদে পড়লে মন খারাপ না করে “ইয়া রাহমানির রাহিম” বলে আল্লাহর কাছে সাহায্য চাইতে হবে। কারণ তাঁর দয়া আমাদের সমস্ত সমস্যার চেয়ে অনেক বড়। সূরা ফাতিহা আয়াত ৩ তাফসীর
🔍 সূরা ফাতিহা ও আল-ফাতহ নিয়ে কিছু গুরুত্বপূর্ণ জিজ্ঞাসা
১. সূরা ফাতিহার প্রথম তিনটি আয়াত কী কী?
সূরা ফাতিহার প্রথম তিনটি আয়াত হলো:
- আয়াত ১: بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَٰنِ الرَّحِيمِ (বিসমিল্লাহির রহমানির রাহিম) — পরম করুণাময় অতি দয়ালু আল্লাহর নামে (শুরু করছি)।
- আয়াত ২: الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ (আলহামদু লিল্লাহি রাব্বিল আলামিন) — সমস্ত প্রশংসা একমাত্র আল্লাহর জন্য, যিনি সকল সৃষ্টির পালনকর্তা।
- আয়াত ৩: الرَّحْمَٰنِ الرَّحِيمِ (আর-রাহমানির রাহিম) — যিনি পরম করুণাময়, অতি দয়ালু।
২. সূরা আল ফাতহ এর ৩ নাম্বার আয়াত কি?
যেহেতু আমরা সূরা ফাতিহা নিয়ে কাজ করছি, অনেকে ভুল করে বা মিল থাকার কারণে “সূরা আল ফাতহ” লিখেও সার্চ করে ফেলে। সূরা আল-ফাতহ (কুরআনের ৪৮ নম্বর সূরা) এর ৩ নম্বর আয়াতটি হলো:
وَيَنصُرَكَ اللَّهُ نَصْرًا عَزِيزًا
- উচ্চারণ: ওয়া ইয়ানসুরাকাল্লাহু নাসরান আজিজা।
- অর্থ: “এবং আল্লাহ আপনাকে জোরালো/মহিমান্বিত সাহায্য করবেন।” (এটি রাসুলুল্লাহ সা.-এর মক্কা বিজয়ের প্রেক্ষাপটে নাজিল হওয়া একটি ঐতিহাসিক আয়াত)।
৩. সূরা ফাতিহার তাফসির কী?
সংক্ষেপে, সূরা ফাতিহার তাফসীর হলো আল্লাহর সার্বভৌমত্ব, তাঁর দয়া এবং বান্দার সাথে আল্লাহর সম্পর্কের এক মহাসমুদ্র। এই সূরায় প্রথম ৩ আয়াতে আল্লাহর প্রশংসা ও তাঁর গুণের কথা বলা হয়েছে, মাঝের আয়াতে আল্লাহর সাথে বান্দার চুক্তির কথা বলা হয়েছে (আমরা শুধু তোমারই ইবাদত করি), আর শেষ ৩ আয়াতে আল্লাহর কাছে সঠিক পথের (সিরাতুল মুস্তাকিম) হেদায়েত ও প্রার্থনা করা হয়েছে। এটি পুরো কুরআনের একটি সংক্ষিপ্ত সারসংক্ষেপ বা মূল নির্যাস।
৪. সূরা ফাতিহার আমল ও ফজিলত কী?
সূরা ফাতিহার ফজিলত অপরিসীম:
- উম্মুল কুরআন: এটিকে কুরআনের মা বা মূল ভিত্তি বলা হয়। সালাত বা নামাজ এই সূরা ছাড়া কবুল হয় না।
- সূরা আশ-শিফা (রোগমুক্তি): এই সূরা পড়ে ফুঁ দিলে আল্লাহ কঠিন রোগ ও বিষাক্ত কামড় থেকে মুক্তি দেন (বুখারীর হাদিস)।
- নূর বা আলো: এটি আরশের নিচের বিশেষ ভান্ডার থেকে নাজিল হওয়া একটি নূর, যা অন্য কোনো নবীকে দেওয়া হয়নি।
- আমল: প্রতিদিন ফরজ ও নফল নামাজে তো এটি পড়াই হয়, পাশাপাশি যেকোনো কঠিন বিপদ-আপদে বা অসুস্থতায় এই সূরাটি বেশি বেশি তিলাওয়াত করে দোয়া করা অত্যন্ত কার্যকরী আমল।
۵. আলহামদুলিল্লাহ সুরা অর্থ কি?
সাধারণ মানুষ অনেক সময় সূরা ফাতিহাকে “আলহামদুলিল্লাহ সূরা” নামে ডাকে। এর মূল অর্থ হলো: “সমস্ত প্রশংসা ও কৃতজ্ঞতা একমাত্র বিশ্বজগতের প্রতিপালক আল্লাহর জন্য।” এটি বান্দার পক্ষ থেকে আল্লাহর প্রতি সর্বোচ্চ কৃতজ্ঞতা প্রকাশের বাণী।
৬. সূরা ফাতিহা কি কুরআনের অংশ?
হ্যাঁ, সূরা ফাতিহা ১০০% পবিত্র আল কুরআনের অংশ এবং এটি কুরআনের সর্বপ্রথম সূরা (১ নম্বর সূরা)। এটি মক্কায় নাজিল হয়েছে এবং এর মোট আয়াত সংখ্যা ৭টি। এটি ছাড়া কুরআনের সূচনা বা তিলাওয়াত পূর্ণাঙ্গ হয় না।
❓ সচরাচর জিজ্ঞাস্য প্রশ্নাবলী
আল্লাহ যদি এতই দয়ালু (আর-রাহমানির রাহিম) হন, তবে পৃথিবীতে এত দুঃখ, কষ্ট বা যুদ্ধ কেন থাকে?
এই পৃথিবী আমাদের চিরকাল থাকার জায়গা বা আনন্দের জায়গা হিসেবে তৈরি করা হয়নি। এটি একটি পরীক্ষাগার (Exam Hall)। পরীক্ষায় যেমন কঠিন প্রশ্ন থাকে, তেমনি জীবনের কষ্টগুলো হলো মানুষের ধৈর্য পরীক্ষার মাধ্যম। আল্লাহ দয়ালু বলেই কষ্টের পর মানুষকে পুরস্কৃত করেন এবং মুমিনের কষ্টের বিনিময়ে তার গুনাহ মাফ করে দেন। চূড়ান্ত এবং চিরস্থায়ী শান্তির জায়গা হলো জান্নাত, যেখানে কোনো দুঃখ থাকবে না।
‘রাহমান’ এবং ‘রাহিম’-এর মধ্যে মূল পার্থক্যটা সংক্ষেপে কী?
সংক্ষেপে, ‘রাহমান’ হলো আল্লাহর এমন দয়া যা দুনিয়ার সকল সৃষ্টির জন্য (মুমিন ও কাফের সবার জন্য) সাধারণ ও ব্যাপক। আর ‘রাহিম’ হলো আল্লাহর এমন বিশেষ ও চিরস্থায়ী দয়া যা পরকালে শুধুমাত্র ঈমানদার মুমিন বান্দাদের জন্য নির্দিষ্ট।
গুনাহ মাফের জন্য এই দুটি নামের উসিলা কীভাবে নেওয়া যায়?
দোয়া করার সময় আল্লাহর এই সুন্দর নাম ধরে ডাকা অত্যন্ত কার্যকরী সুন্নাত। আপনি বলতে পারেন, “ইয়া রাহমানু ইয়া রাহিম, আমি নিজের ওপর জুলুম করেছি, আপনি আপনার দয়ার উসিলায় আমাকে ক্ষমা করে দিন।” আল্লাহ তাঁর এই দুটি নামের উসিলায় করা দোয়া ফিরিয়ে দেন না।
🔗 রেফারেন্স ও সোর্স লিংক (Information Sources)
এই বিস্তারিত সূরা ফাতিহা আয়াত ৩ তাফসীর আর্টিকেলটি তৈরি করতে নির্ভরযোগ্য এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইসলামিক উৎস ও তাফসীরগ্রন্থের সরাসরি সাহায্য নেওয়া হয়েছে:
- তাফসীর ইবনে কাসীর (Surah Al-Fatiha Ayat 3): Quran.com – Tafsir Ibn Kathir
- হাদিস গ্রন্থ (আল্লাহর ১০০ ভাগ দয়া ও মায়ের চেয়ে দয়ালু হাদিস): Sunnah.com – সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম
- আরবি শব্দের ব্যাকরণগত বিশ্লেষণ: Quranic-Arabic.org – রাহমান ও রাহিম শব্দের ওজন
🔗 পরবর্তী ও আগের পর্বের লিংক (Internal Linking)
- পূর্ববর্তী আয়াত পড়তে ক্লিক করুন: সূরা আল-ফাতিহা আয়াত ২ বিস্তারিত তাফসীর ও ব্যাখ্যা
📝 আমাদের পরিচয় ও লক্ষ্য (About Us)
“আল-হাকিম (AL-HAKIM) ওয়েবসাইটের প্রকৃত মালিক মহান আল্লাহ তাআলা। আমি কেবল তাঁর একজন নগণ্য গোলাম ও কর্মচারী মাত্র।”
পবিত্র কুরআন ও সুন্নাহর বিশুদ্ধ আলো সবার মাঝে ছড়িয়ে দেওয়ার এই ক্ষুদ্র প্রয়াস আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা কবুল করুন। আমাদের মূল লক্ষ্য—প্রিয় নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পবিত্র হাদিসসমূহ এবং কুরআনের তাফসীরকে অত্যন্ত সহজ ও সাবলীল ভাষায় আপনাদের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া। আল্লাহ যেন এই দ্বীনি খিদমতকে আমাদের জন্য সদকায়ে জারিয়া হিসেবে কবুল করেন এবং আমাদের সবাইকে সিরাতুল মুস্তাকিমের ওপর হেদায়েত দান করেন। আমিন।
🤲 দ্বীনি কাজে আপনার সহযোগিতা কাম্য (Donate)
প্রিয় পাঠক, ‘আল হাকিম’ (alhakimbd.top) একটি সম্পূর্ণ অলাভজনক ইসলামিক প্ল্যাটফর্ম। প্রতিদিন লাখো মানুষের কাছে সঠিক দ্বীনি জ্ঞান, কুরআন-হাদিসের আলো এবং বিশুদ্ধ ইসলামিক কন্টেন্ট পৌঁছে দেওয়াই আমাদের একমাত্র লক্ষ্য। এই বিশাল দ্বীনি দাওয়াহ কাজটি সচল রাখতে আপনাদের আন্তরিক সহযোগিতা ও অনুদান অত্যন্ত প্রয়োজন। আপনার দেওয়া একটি ছোট কন্ট্রিবিউশন হতে পারে আপনার জন্য চলমান সদকায়ে جاریয়া।
আপনি যদি আমাদের এই দ্বীনি প্রচারণায় আর্থিক সহযোগিতা করতে চান, তবে আপনার সামর্থ্য অনুযায়ী অনুদান পাঠাতে পারেন।
(ডোনেশন দিতে বা বিস্তারিত জানতে আমাদের [ডোনেশন ] করুন অথবা সরাসরি যোগাযোগ করুন।)
Tags: সূরা ফাতিহা আয়াত ৩ তাফসীর, আর রাহমানির রাহিম, সূরা ফাতিহা তাফসির, কুরআন অনুবাদ বাংলা, আল হাকিম, কুরআন [A3/৬২৩৬]
